| ঢাকা, বুধবার, ০৩ মার্চ, ২০২১

গুনীজন - ড.মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন

January 6, 2020
Image

যে কয়জন প্রথিতযশা ব্যক্তি বাংলাদেশের দারিদ্র্য বিমোচন ও উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছেন তাদের মধ্যে অর্থনীতিবিদ ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন অন্যতম। তিনি একাধারে একজন চৌকস সরকারি কর্মকর্তা এবং শিক্ষাবিদ।

ড.মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ‘বাংলাদেশ ব্যাংকের’ সপ্তম গভর্ণর ছিলেন।

মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন ১৯৪২ সালের ১৮ই এপ্রিল সিলেটের হবিগঞ্জ জেলার মাধবপুরে রতনপুর গ্রামে জন্মগ্রহন করেন। ১৯৫৮ সালে সিলেট সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় এসএসসি ও ১৯৫৮ সালে সিলেট এমসি কলেজ থেকে এইচএসসি পাশ করে তিনি ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে। ১৯৬৩ সালে অর্থনীতেতে স্নাতক ও ১৯৬৩ সালে স্নাতোকত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। উভয় পরীক্ষাতেই তিনি ১ম স্থান লাভ করেন। এরপর ১৯৭৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের বোষ্ট্ন ইউনিভার্সিটি থেকে পলিটিক্যাল ইকোনমিকস-এ স্নাতকোত্তর ও কস্ট বেনিফিট অ্যানালাইসিস-এ পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন।

ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে শিক্ষকতা দিয়ে কর্মজীবন শুরু করেন। ১৯৬৬ সালে তৎকালীন পাকিস্তান সিভিল সার্ভিসে যোগদান দেন এবং বৃহত্তর জামালপুরের এসডিও হিসেবে, বৃহত্তর ময়মনসিংহ ও রাজশাহীর অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক ও করাচীর অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ থেকে ১৯৭৫ সনের ১২ই আগস্ট পর্যন্ত তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের একান্ত সচিব হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন।

বিগত ৫০ বছরের কর্মজীবনে ড. ফরাসউদ্দিন দেশ-বিদেশের দারিদ্র্য বিমোচন ও উন্নয়নে অসাধারন অবদান রেখে সর্বমহলের প্রশংসা পেয়েছেন। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিনের যথেষ্ট সুনাম রয়েছে। সবার চোখে তিনি একজন একাধারে একজন অর্থনীতিবিদ, সমাজসেবা কর্মী, শিক্ষাবিদ এবং দেশীয় ও আন্তর্জাতিক উন্নয়ন কর্মী। ১৯৮৫ সালে জাতিসংঘের উন্নয়ন সংস্থা ইউএনডিপিতে যোগদান করে প্রায় ১৩ বছর সাফল্যের সাথে সেখানে কাজ করেন মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন। ১৯৯৬ সালে দেশে ফিরে বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের বা পিকেএসএফ-এর সভাপতি হিসেবে নিয়োগ পান।

মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন দেশীয় ও আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতার সমন্বয় ঘটিয়ে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোকে দেশের উন্নয়নে সম্পৃক্ত করেছিলেন, একই সাথে সরকারি ও বেসরকারি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোর সঙ্গে সেতুবন্ধ ঘটিয়ে দেশের দারিদ্র্য বিমোচনে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছেন। ১৯৯৬ থেকে ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত তিনি পিকেএসএফের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। সে সময় ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম সম্প্রসারণ ও দরিদ্র মানুষের কাছে ক্ষুদ্রঋণ সহজলভ্যকরণে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন সূচিত হয়।

১৯৯৮-২০০৯ মেয়াদে ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্ণর ছিলেন। এছাড়া তিনি ১৯৯৬ সালে ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি প্রতিষ্ঠা করেন এবং এটির উপাচার্য্য হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। বর্তমানে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান।

তিনি কখনও প্রত্যক্ষ রাজনীতির সাথে জরিত ছিলেন না তবে ১৯৬৩ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এস এম হলের ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসাবে নির্বাচিত হয়েছিলেন। ঢাকা স্কুল অব ইকনোমিকস স্থাপনে তার অসাধারন ভূমিকা রয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএ এবং বাণিজ্য অনুষদে ভিজিটিং প্রফেসর হিসেবেও ডঃ ফরাসউদ্দিন কাজ করছেন। তিনি দেশের নামকারা গবেষণা প্রতিষ্ঠান বিআইডিএস-এর একজন সিনিয়র ফেলো এবং ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য। এছাড়া ডঃ মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন ৯০এর দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সদস্য ছিলেন। বিভিন্ন সময় মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা বা কমিটিতে কাজ করেছেন। সরকারের পঞ্চম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনাতে পরামর্শক কমিটির একজন সদস্য ছিলেন। তাছাড়া শামসুল হক শিক্ষা কমিশনের সদস্য ছিলেন। এসবের পাশাপাশি বর্তমানে ঢাকা সিটি কলেজের গভর্ণিং বডির চেয়ারম্যান এবং শাবিপ্রবি-এর একাডেমিক কাউন্সিলের সদস্য হিসেবে কাজ করছেন। তিনি ২০১৩ সালে সরকারের বেতন কমিশন এর চেয়ারম্যান হিসাবে দায়িত্ব পালন করছেন।

ডঃ মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন চৌকস অর্থনীতিবিদ ছাড়াও একজন একজন সুলেখক হিসেবেও পরিচিত এবং তাঁর বেশ কয়েকটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। এর মধ্যে ‘প্রথম দর্শনে বঙ্গবন্ধু’ এবং ‘গণতন্ত্রের পথেই অর্থনৈতিক মুক্তি’ উল্লেখযোগ্য। তিনি তার অসাধারন কৃতিত্বর জন্য বিভিন্ন সময়ে অনেক পুরুস্কার লাভ করেছেন। যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক বোষ্ট্ন ইউনিভার্সিটির ১৯৭৮ সালে সেরা বিদেশী ছাত্র, সরোজিনী নাইডু গোল্ড মেডেল ২০০৮ সালে, মার্কেন্টাইল ব্যাংক পুরস্কার ২০০৯ সালে ও ২০১২ সালে আমেরিকার বস্নুমসবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘আউটস্ট্যান্ডিং লীডারশিপ ইন হাইয়ার এডুকেশন’ পুরস্কার অর্জন করেন।

PREVIOS POST
গুনীজন – ফজলে হাসান আবেদ
NEXT POST
বাংলাদেশের সংস্কৃতি

Related Posts